কোভিড-পরবর্তী মানব পাচারের ঝুঁকি বেড়েছে : থেমে নেই শিশু-কিশোরী ও রোহিঙ্গা পাচার।
কোভিড মহামারির আগেও বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৬ থেকে ৭ লাখ লোক বৈধভাবে বিদেশে গেছেন। কিন্তু গত বছরের মার্চে মহামারি শুরুর পর সেই সংখ্যা ২ লাখে নেমে আসে। ফলে সামনের দিনগুলোতে লোকজন বিদেশে যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠতে পারে। ফলে অনিয়মিত অভিবাসন ও মানব পাচারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের অন্তত ৩০টি জেলার সঙ্গে ভারতের সীমান্ত আছে। ফলে এসব সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশু পাচারের নিয়মিত ঘটনা ঘটছে। গত কয়েক বছরে পাচারের ক্ষেত্রে ফেসবুক, টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগের নানা মাধ্যম বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভারতে ভালো চাকরির লোভ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। পাচারকারীরা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সংকটে থাকা পরিবারের শিশু-কিশোরীদেরকেই পাচারের জন্য টার্গেট করে। পরে তাদের মানব পাচার চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এই নারীদের বেশির ভাগকে জোর করে যৌন পেশায় বাধ্য করা হয় বলে জানান সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। নারী পাচারের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে গত মাসের শেষ দিকে ভারতে বাংলাদেশি এক তরুণীকে পৈশাচিক নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর। এদিকে ঘটনার পর পুলিশ ও র্যাব নারী পাচারে জড়িত দুটি চক্রের ১২ জনকে গ্রেফতার করেছে। শুধু এই দুই চক্র পাঁচ বছরে প্রায় ২ হাজার নারীকে ভারতে পাচার করেছে বলে পুলিশ ও র্যাব দাবি করেছে। অন্যদিকে ভারতে পাচার হওয়া প্রায় ২ হাজার নারীকে গত ১০ বছরে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।এরপরেই আছে ১১ থেকে ১৫ বছরের কিশোরীরা। যাদের বেশির ভাগই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলার।২০১২ থেকে ২০২০ পর্যন্ত মানব পাচারের যেসব মামলা হয়েছে তাতে দেখা গেছে, প্রায় ২ হাজার নারী মানব পাচারের শিকার হয়েছেন। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী শুধুমাত্র ২০২০ সালে অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমকালে উদ্ধারকৃত নারীর সংখ্যা ৩০৩ জন।দেশের ভেতরকার পাচারের মামলাগুলো তদন্ত করা সহজ, কারণ সব তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু বিদেশে পাচারের ঘটনায় অধিকাংশ সময় ভুক্তভোগীরা যথেষ্ট তথ্য দিতে চান না। আবার অনেক মামলার বাদী বা ভুক্তভোগীকেই পাওয়া যায় না। তবে পুলিশ দেশে-বিদেশে পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক খুঁজছে। পাচারকারীরা পার পাবে না।
২০১৭ সালে ২৫ আগস্ট থেকে ১০ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয় বাংলাদেশে। সেখান থেকে ফের মানব পাচার শুরু হয়। বাংলাদেশ থেকে সোয়া লাখ মানুষ পাচারের শিকার হয়েছে যার বেশির ভাগই রোহিঙ্গা।২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে ১ হাজার ৫৯৭ জন রোহিঙ্গা পাচার হয়। ২০২০ সালে অন্তত ২ হাজার ৪০০ মানুষ সাগরপথ পাড়ি দিয়েছে। এভাবে যেতে গিয়ে অন্তত ২০০ জন ডুবে গেছে। বাংলাদেশ থেকে মোট ১৮টি রুটে লোকজন ইউরোপে যাওয়ার কম-বেশি চেষ্টা করছেন। বাংলাদেশিরা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে, যেটি সেন্ট্রাল মেডিটেরিয়ান রুট হিসেবে পরিচিত।
এই মহামারিতেও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছে যেসব দেশের মানুষ, তাদের শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। যারা ইউরোপে যাচ্ছে তাদের বেশির ভাগের বয়স ২৫ থেকে ৪০। অবশ্য শুধু ইউরোপ নয়, করোনা মহামারির মধ্যেও শ্রম অভিবাসনের নামে মানব পাচার কিংবা ভারতে নারী-কিশোরী পাচার কোনোটাই থেমে নেই।
শ্রম অভিবাসনের নামে ভিজিট ভিসায় দুবাই যাচ্ছে লোকজন। দুবাই এবং ওমানে নতুন আসা বাংলাদেশি তরুণরাই মূলত পাচারকারীদের প্রধান টার্গেট। দুবাই এবং ওমান থেকে তাদের নিয়ে আসা হয় ওমানের মাসকট বন্দরে। সেখান থেকে স্পিডবোটে ওমান উপসাগর অতিক্রম করে নিয়ে যায় ইরানের বন্দর আব্বাসে। তারপর ইরানের বিভিন্ন শহর ও জঙ্গলে আটক রাখে। সেখান থেকে ইরাক ও তুরস্ক হয়ে ইউরোপে প্রবেশ করার চেষ্টা চলে। এভাবে যাওয়ার সময় অনেকেই ইরানে আটক হচ্ছেন।
করোনা পরিস্থিতির মধ্যে দেশে বহু শিশু শ্রম বিক্রিতে বাধ্য হচ্ছে। পরিবারের অসচ্ছলতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা এবং কারখানাগুলো লোকসানের কারণে কম বেতনে শিশু শ্রমিক নিয়োগ দিচ্ছে। এখন আগের চেয়ে বেশি শিশু শ্রমিক কম মজুরিতে পাওয়া যাচ্ছে। সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হাশেম ফুডস লিমিটেডের ছয়তলা ভবনের অগ্নিকাণ্ডে শিশুশ্রমের ভয়াবহ রূপ আবার সামনে উঠে আসে।
মহামারির আগেও দেশে বিভিন্ন সেক্টরে উল্লেখযোগ্য শিশু শ্রমিক থাকলেও তারা সরকারি বা এনজিও পরিচালিত স্কুলেও যেত। কিন্তু মহামারিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় এবং পরিবারে আর্থিক অনটনের কারণে দরিদ্র এই শিশুরা পুরো সময় কাজে নিয়োজিত হয়েছে, ফলে স্কুলে ফিরে যাওয়া তাদের পক্ষে আর সম্ভব নয়।
সরকার মালিক, শ্রমিক ও সুশীল সমাজের সঙ্গে কথা বলে ঝুঁকিপূর্ণ ৩৮টি কাজ ঘোষণা করলেও এসব কাজে এখনো শিশুদের কাজ করতে দেখা যায়।ট্রাক বা টেম্পো ও বাসের হেল্পার শিশুরা সড়ক দুর্ঘটনা, ওজন কমা, কোষ্ঠকাঠিন্য, শ্রবণশক্তি হ্রাস, শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। অটোমোবাইল ওয়ার্কশপে যে শিশুরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গ্রিজ, কেরোসিন, মবিল ব্যবহার করে যন্ত্রপাতির কাজ করছে তারা প্রায়ই কোনো না কোনো শারীরিক আঘাত পাচ্ছে।ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ বা লেদ মেশিনে যারা কাজ করছে তাদের শিরায় রক্ত জমাট, চোখের প্রদাহ ও দৃষ্টিশক্তির সমস্যায় ভুগছে। বিস্কুট ফ্যাক্টরি বা বেকারিতে কর্মরত শিশুদের মাথাব্যথা, বমি হওয়া, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস, ক্ষুধামন্দা, পাকস্থলীতে ঘা, যকৃতে প্রদাহ হয়। বিড়ি ও সিগারেট তৈরির কারখানায় যারা কাজ করছে তারা ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হয়। ইট ও পাথর ভাঙার কাজ করে যে শিশু তারাও প্রায় দিন দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।তাদের শ্রবণশক্তি এবং দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পাচ্ছে। ম্যাচ তৈরির কারখানায় কর্মরত শিশুরা আঙুলে ঘা, বাতজনিত সমস্যা ও শ্বাসতন্ত্রেও রোগ হয়। আর প্লাস্টিক তৈরির কারখানার শিশুদের শুষ্ক কাশি, নিউমোনিয়া, হাঁপানি, ফুসফুসের প্রদাহ হয়। সাবান তৈরির কারখানার কাজে শিশুর চুলকানি, হাত-পায়ের আঙুলে ক্ষত, কাশি, নিউমোনিয়া ও হাঁপানি হয়।