চা বাগানে সুপারি চাষ : একসাথে দুই ফসল
আলী আজগর খোকন (তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়)
চা বাগানে সুপারি চাষ! একই পরিচর্যা, একই সার-কীটনাশক এবং একই পরিশ্রমে গড়ে উঠতে পারে লাভজনক সুপারি বাগান। একসাথে দুই ফসল ঘরে তোলা সম্ভব সহজেই। সুপারি গাছে অতিরিক্ত ডালপালা বা ঘণ ছায়া না হওয়ায় চা বাগানে ক্ষতির বিবেচনায় এটি ঝুঁকিমুক্ত। তাই, চা বাগানের বাউন্ডারি (প্রান্তসীমা) এলাকায় উপযুক্ত সাথী ফসল হিসেবে অনায়াসেই চাষ করা যেতে পারে সুপারি। চা বাগানগুলোকে এভাবে কাজে লাগালে ‘সুপারি চাষ’ বিশেষায়িত একটি খাত হিসেবে পঞ্চগড়ের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পঞ্চগড় জেলায় ২ যুগ আগে শুরু হওয়া চা চাষ লাভজনক ও অর্থকরী ফসল হিসেবে প্রচার পাওয়ার পর কৃষকেরা ধীরে ধীরে চা চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েন। কিছু চাষী নিজ উদ্যোগে চা বাগানের সাথে ছায়া/সাথী ফসল হিসেবে সুপারি চাষ করে বাম্পার ফলনও পাচ্ছেন। সুপারি যদিও উপকূলীয় এলাকায় বেশি উৎপাদন হয়ে থাকে, কিন্তু পঞ্চগড়ের মাটির পিএইচ মান (৪-৬) এডজাস্ট হওয়ায় এই এলাকাতেও প্রচুর ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে চায়ের মতো সুপারি চাষও পঞ্চগড়ের প্রধানতম অর্থকরী ফসলে পরিণত হতে।
সুপারি রোপনের উপযুক্ত সময়কাল জুলাই-সেপ্টেম্বর মাস। উন্নত জাতের সুপারি চারা হলে ৪ বছর আর দেশী জাতের হলে ৭-৮ বছর বয়সী গাছে ফলন হয়ে থাকে। উন্নত খাটো জাতের সুপারির মধ্যে মিয়ানমার, উড়িষ্যা, বারি-১ এবং ২ এর খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও পত্র-পত্রিকায় বেশি পাওয়া যায়। এ ছাড়াও অঞ্চলভেদে কিছু স্থানীয় জাত রয়েছে। এরমধ্যে বরিশাল, নোয়াখালী, খুলনা, রাজশাহী এবং রংপুরের শটিবাড়ির জাত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন নার্সারি এবং বড় খামারীরা সুপারির চারা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন ও বিক্রি করছেন। সেখান থেকেও চারা সংগ্রহ ও রোপন করা যেতে পারে। মে-জুন মাসে স্থানীয়ভাবে পরিপক্ক সুপারি সংগ্রহ করে ‘পাটিয়ে’ ১ বা ২ বছর পর রোপন করলেও ভালো মানের চারা ও ফলন পাওয়া যেতে পারে।
সুপারি একটি পামগোত্রীয় গাছ। প্রাচীনকালে মানুষ এটিকে কেবল বিনোদন তথা অতিথি আপ্যায়নের অংশ হিসেবে চর্চা করে এসেছে। আধুনিককালে এটি আর অতিথি আপ্যায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সুপারির বহুমূখী ব্যবহারিক উপযোগিতা রয়েছে। এর ভেজষ গুণও প্রশংসিত। তবে, অতিমাত্রার সেবনে নানা ধরণের অসুখ-বিসুখ হওয়ারও নজির রয়েছে।
বর্তমান সময়ে সুপারি ও সুপারি গাছের কোন অংশকেই অকেজো মনে করা যাচ্ছে না। সুপারি থেকে উন্নতমানের ঔষধ এবং রং তৈরি করা হয়। ছোবড়া থেকে আঁশ। খোল/ডাইগ্গা থেকে ডিসপোজেবল প্লেট, বাটি, মগ, কাপ তৈরি হচ্ছে। খোলের অতিরিক্ত অংশ, পাতা, শিকড় থেকে মণ্ড, কাগজ, বোর্ড ও ব্যাগসহ পরিবেশবান্ধন নানা ধরণের উপকরণ তৈরি করা হচ্ছে। এ ছাড়া, প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানীর বড় একটি সোর্স হলো সুপারি গাছ। কাজেই, অধিকহারে সুপারি গাছ লাগিয়ে যেমন পরিবেশের উন্নয়ন করা যায়, তেমনি অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হওয়া যায় সুপারি চাষ থেকে।